শব্দ নিয়ে তর্ক—বিপ্লব ও অন্যান্য


১.

বিপ্লব, ইনকিলাব, সাওরাহ—এ শব্দগুলো নিয়ে কেউ কেউ আপত্তি করেন। কেউ বলেন এটা পশ্চিমা কনসেপ্ট। কেউ বলেন বামপন্থার বিষয়। কেউ বলেন কুরআন-সুন্নাহতে এই শব্দগুলো নেই, অথবা সালাফুস সালেহিনের যুগে এগুলো ছিল না, তাই এটা ব্যবহার করা ভুল, বিচ্যুতি কিংবা আরও গুরুতর কিছু।

.

যদিও বাস্তবতা হল, রাষ্ট্র ও সমাজবিজ্ঞানের সংজ্ঞা অনুযায়ী আধুনিক সময়ে বিপ্লবের প্রথমদিকের দৃষ্টান্ত ধরা হয় ইংল্যান্ডের গ্লোরিয়াস রেভ্যুলুশান এবং অ্যামেরিকান রেভ্যুলুশানকে। যার সাথে বামপন্থার কোন সম্পর্ক নেই, এগুলো বামপন্থাকে প্রিডেইট অরে। অনেক অ্যান্টি-কলোনিয়াল লড়াইকে বিপ্লব, ১৯৭৯ এর ইরানের ঘটনাকে বিপ্লব গণ্য করা হয়—এগুলোর সাথেও বামপন্থার কোন সম্পর্ক নেই।

পাশাপাশি এটাও মাথায় রাখা দরকার যে, বর্তমানে পৃথিবীতে যতোগুলো প্রভাবশালী ইসলামী ধারা আছে তাদের সবার কাছ থেকেই এ শব্দগুলো ব্যবহার দেখা যায়। ইখওয়ানী ধারা, দেওবন্দী ধারা, সালাফি ধারা সবার লেখা ও আলোচনাতে শব্দগুলো পাওয়া যায়।

মাওলানা মওদুদী থেকে শুরু করে সাইয়্যিদ কুতুব, মাওলানা আবুল হাসান আলী নাদভী, ইসরার আহমেদ, মাওলানা আব্দুর রহীম (রাহিমাহুমুল্লাহ) দেওবন্দী ধারার আলেমরা বিপ্লবের কথা বলেছেন। পাকিস্তানের গোত্রীয় অঞ্চলে দেখলাম একটি দেওবন্দী সশস্ত্র গ্রুপই আছে ইনকিলাবে ইসলামী নামে।

১৯৭৯ ইরানে যখন বিপ্লব হয় তখন পুরো বিশ্বের ইসলামী আন্দোলনগুলো সেটাকে স্বাগত জানায়, যদিও পরে তাদের অধিকাংশই আকীদাহগত কারণে ইরানের শাসকগোষ্ঠীর সমালোচনার অবস্থান নেন। কারো বিশ্বাস না হলে এ ব্যাপারে শাইখ আযযামের আলোচনা পড়ে দেখতে পারে।

সালাফিদের মধ্যে যাদেরকে সবচেয়ে র‍্যাডিকাল মনে করা হয়, তাঁরাও এই শব্দগুলো ব্যবহার করেন। সাওরাহ-এর ওপর এমন ব্যক্তি বই লিখেছেন যার নাম লিখলে দেখা যাবে আইডি রেস্ট্রিকশানে পড়ে গেছে।

অর্থাৎ, বিপ্লব শব্দের ব্যবহার আজকে নতুন কিছু না। এবং এই ধারাগুলো (বা অন্তত তাদের সিগনিফিক্যান্ট একটা অংশ) এই শব্দগুলোর ব্যবহারকে ভুল মনে করেন না।

তবে এ কথা সত্য যে বিপ্লব, ইনকিলাব, সাওরাহ—এগুলো আধুনিক সময়ের বিষয়। কুরআন-সুন্নাহতে এগুলো পাওয়া যায় না (ইনকিলাবের শব্দের একটা ফর্ম কুরআনে আছে বলে একটা আর্গুমেন্ট দেয়া যায়, সে আলাপে আপাতত গেলাম না)। ক্লাসিক্যাল লিট্রেচারেও না।

কিন্তু তার মানে কি এই কনসেপ্ট ইসলামবিরোধী এবং এগুলো ব্যবহার করা ভুল?

এই নীতি কি কনসিসটেন্টলি প্রয়োগ করা হবে?

২.

ইসলামী রাষ্ট্র, দাওলাহ ইসলামিয়্যাহ—এই পরিভাষার কথা চিন্তা করুন।

রাষ্ট্র অর্থে দাওলাহ শব্দের ব্যবহার কুরআন-সুন্নাহয় পাওয়া যায় না। ক্লাসিকাল ইলমী লেখাগুলোতেও পাওয়া যায় না। শাসনব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করার সময় পূর্বযুগের উলামায়ে কেরাম খিলাফাহ, ইমামাহ, ইমারাহ, সুলতানিয়্যাহ, মুলক ইত্যাদি শব্দ ব্যবহার করেছেন। দাওলাহ না।

কুরআনে সূরা আলে ইমরানে (৩:১৪০) এই শব্দের মূল এসেছে: “নুদাউয়িলুহা বাইনান নাস — “আমি এই দিনগুলো মানুষের মধ্যে পালাক্রমে আবর্তন করি।” সূরা হাশরের ৭ নং আয়াতে একটা ফর্ম এসেছে, সেটাও সার্কুলেশন/রোটেশন অর্থে। এর সাথে রাষ্ট্রের যে আধুনিক ধারণা তার দূরতম সম্পর্ক নেই।

মোটামুটি তিনশো বছর আগে পর্যন্ত দাওলাহ শব্দের ব্যবহার হয়েছে ডাইন্যাস্টি এবং পালাবদল বোঝাতে। ইবনু খালদুনের মতো মানুষেরা যেমন দাওলাহ শব্দ ব্যবহার করেছেন মূলত কোন শাসক ডাইন্যাস্টিকে বোঝাতে এবং তাঁদের উত্থানপতনের আলোচনায়। রাষ্ট্র অর্থে না।

আর রাষ্ট্র অর্থে তাঁরা ব্যবহার করবেনই বা কেন। রাষ্ট্র বলতে আমরা আজ যা বুঝি সেটা আরও পরের একটা আবিষ্কার। ইসলামী শাসনব্যবস্থা শুরু থেকেই ছিল, কিন্তু শাসন মানেই রাষ্ট্র না, রাষ্ট্র নামের কাঠামোটা আধুনিক।

দাওলাহকে রাষ্ট্র অর্থে ব্যবহার করার শুরুটা অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ দিকে এবং বিশেষ করে উনবিংশ শতাব্দীতে। এবং এটা সরাসরি ইউরোপীয় রাজনৈতিক চিন্তার সাথে মুসলিম বিশ্বের পরিচিত হওয়া এবং তার সাথে এনগেইজমেন্টের ফসল।

উসমানীরা দেভলেট শব্দটা অনেক আগে থেকে ব্যবহার করতো, কিন্তু ঐ যে ডাইন্যাস্টি এবং এই সংক্রান্ত অর্থে। রাষ্ট্রের মতো অর্থে এর ব্যবহার শুরু হয় অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ দিকে কূটনৈতিক চুক্তিসংক্রান্ত ব্যবহার এবং ইউরোপের অনুকরণে আমলাতান্ত্রিক সংস্কারের সময়ে। এর পর উনবিংশ শতাব্দীতে তানযিমাত সংস্কার এবং আরব নাহদার সময়ে রাষ্ট্র অর্থে দাওলাহ শব্দের ব্যবহার পাকাপোক্ত হয়ে ওঠে।

এই সময়ে ফ্রেঞ্চ état এবং জার্মান Staat-কে আরবী করা হয় দাওলাহ হিসেবে।

আজ দেখবেন সব ঘরানার সবাই ইসলামী রাষ্ট্র কথাটা ব্যবহার করছে। একেবারে উলামায়ে কেরাম থেকে শুরু করে একেবারে সাধারণ মানুষও। কিন্তু রাষ্ট্র জিনিসটা পশ্চিমা, আধুনিক, এবং এর স্ট্রাকচারাল বেশ কিছু বৈশিষ্ট্য আছে যেগুলো ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক। রাষ্ট্র ধারণাটার সাথে পশ্চিমা এনলাইটেনমেন্ট ও সেক্যুলারিসমের আদর্শ অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে আছে। এ পুরো ব্যাপারটা নিয়ে ওয়ায়েইল হাল্লাকের সুন্দর আলোচনা আছে, আগ্রহীরা পড়তে পারেন।

এখন ইসলামী রাষ্ট্র — এই পরিভাষার ব্যাপারে কী অবস্থান হবে?

একটা অবস্থান হতে পারে, যেহেতু এই ব্যাপারটা কুরআন-সুন্নাহয় নেই, সালাফুস সালেহিনের আলোচনায় নেই, অতএব এটা ভুল। যারা এটা ব্যবহার করছে তারা বিভ্রান্ত এবং সেক্যুলার হয়ে গেছে।

আরেকটা অবস্থান হতে পারে, যারা ইসলামী রাষ্ট্র শব্দটা ব্যবহার করছেন তাঁদের বেনেফিট অফ ডাউট দেয়া। অর্থাৎ যারা ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কথা বলেন তাঁরা এর দ্বারা মূলত ইসলামী শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার কথা বলেন। ইসলামী রাষ্ট্র শব্দটা নিয়ে আলাপ হতে পারে, কিন্তু তাঁরা যা বলছেন বা করতে চাচ্ছেন, সেটা ভালো জিনিস।

বিপ্লবের ব্যাপারে যেসব যুক্তি দেখিয়ে আপত্তি করা হয়, সেগুলোতে কনসিসটেন্ট থাকলে প্রথম অবস্থান নিতে হবে।

৩.

আরও উদাহরণ আছে।

তানযীম বা সংগঠনের ধারণার কথা চিন্তা করুন। সালাফুস সালেহিনের সময়ে সংগঠন বলে তো কিছু ছিল না। খালাফদের সময়ে তরীকাহ, গোত্রীয় ফেডারেশন ইত্যাদি পাওয়া যায়। এগুলোও সেই অর্থে পরবর্তী সময়ের আবিষ্কার। কিন্তু আধুনিক যে সংগঠন—যে সদস্যের নির্দিষ্ট সংজ্ঞা আছে, অভ্যন্তরীণ হায়ারার্কি আছে, আদর্শিক কিছু শর্ত আর আর্থিক কিছু দায়িত্ব আছে, লিখিত গঠনতন্ত্র আছে—এই জিনিস কুরআন-সুন্নাহর কোথায় আছে?

সংগঠনের ধারণা এবং ফেনোমেনন, দুটোই আধুনিক। সংগঠনের ধারণা তৈরি হওয়ার পেছনে বিভিন্ন ধরণের প্রভাব আছে যার সবই বলতে গেলে ইউরোপীয়। এর মধ্যে জেসুইটদের প্রভাব আছে, বামপন্থীদের প্রভাব আছে; বিশেষ করে ক্যাডার-ভিত্তিক সংগঠনের পেছনে, এবং এমন আরও অনেকের প্রভাব আছে যেটা বললে অনেকেই হজম করতে পারবেন না।

এমনকি আধুনিক সময়ে ইসলামপন্থা বা ইসলামপন্থী সংগঠনের যে ধারনা সেটাও তো পূর্বযুগে পাওয়া যায় না। এগুলো আধুনিকতার রিয়্যাকশনে তৈরি হয়েছে। আজকে প্রায় ৯৯% ইসলামী সামাজিক ও রাজনৈতিক উদ্যোগ সংগঠনের ফরম্যাটে চলে। বিপ্লবের ব্যাপারে আপত্তির নীতিগুলো সংগঠনের ক্ষেত্রে কনসিসটেন্টভাবে প্রয়োগ করা হবে? এগুলোকে বাতিল বলা হবে?

সংস্কৃতি কনসেপ্টটার কথা চিন্তা করুন। সংস্কৃতির কনসেপ্টটা একটা আধুনিক ইউরোপীয় বিতর্কের ফল। অষ্টাদশ এবং উনবিংশ শতাব্দীতে ইউরোপে, বিশেষ করে জার্মানদের মধ্যে Kultur নিয়ে বিভিন্ন বিতর্ক ছিল। সেখান থেকেই ধীরে ধীরে আধুনিক লেক্সিকনে সংস্কৃতি কনসেপ্টটা আসে।

সংস্কৃতির আরবী পরিশব্দ সাকাফা। এই শব্দ আরবীতে অনেক আগে থেকেই আছে, কিন্তু কালচার বলতে যা বোঝানো হয়, নুবুওয়াত, সালাফুস সালেহিন বা ইমামগণের যুগে এই অর্থে কেউ এই শব্দ ব্যবহার করতো না।

বর্তমান সময়ে ইসলামী ধারার মানুষেরা যখন লেখেন, পশ্চিমা আগ্রাসনের কারণে ইসলামী সংস্কৃতি হুমকির মুখে, তখন তারা এমন একটা শব্দ এবং ধারণা ব্যবহার করছেন যা ইউরোপীয় আধুনিকতা থেকে বের হয়ে আসা।

একই অবস্থা সভ্যতার ক্ষেত্রেও। একটা বিশাল, সুসংহত এবং বিশ্ব-ঐতিহাসিক সত্তা, যার সুনির্দিষ্ট গতিপথ আর লক্ষ্য আছে এবং যে টিকে থাকে তার প্রতিদ্বন্দ্বীদের সাথে পাল্লা দিয়ে — এই অর্থে Civilization শব্দ এবং ধারণাটা এনলাইটেনমেন্টের চিন্তার ফলাফল। প্রথমে গিযো পরে টয়েনবির মতো গবেষকরা একে জনপ্রিয় করেছেন।

সভ্যতার জন্য আরবীতে হাদারা শব্দটা ব্যবহার হয়, কিন্তু এই ধরণের ব্যবহার নতুন। ইবনু খালদুন মুকাদ্দিমায় হাদারা ব্যবহার করেছেন স্থায়ী, নগরকেন্দ্রিক জীবনযাত্রা বোঝাতে। এর বিপরীতে এনেছেন বাদাওয়াহ বা যাযাবরের জীবনযাত্রাকে।

অর্থাৎ আজ যখন আমরা ‘ইসলামী সভ্যতা’র কথা বলছি বাংলায়, উর্দু কিংবা আরবীতে তখন আমরা অন্তত শাব্দিকভাবে বিজাতীয়, পশ্চিমা ফ্রেইমওয়ার্ক ব্যবহার করছি।

আরেক ধরণের শব্দ আছে। যেগুলো কুরআন-সুন্নাহতে পাওয়া যায়। কিন্তু বর্তমানে সেগুলোকে রিপারপাস করা হয়েছে। এই শব্দগুলো দিয়ে এখন এমন আরও অনেক কিছু বোঝানো হচ্ছে যা কুরআন-সুন্নাহর ব্যবহারে পাওয়া যায় না।

কুরআনে যেমন ‘হিযব’ শব্দটা আছে। হিযবুল্লাহ, হিযবুশশাইতান। কিন্তু হিযব শব্দটা রাজনৈতিক দল হিসেবে ব্যবহার হয়। যে পার্টির নিজস্ব গঠনতন্ত্র, সদস্যপদের শর্ত, পদ-পদবী হায়ারার্কি ইত্যাদি আছে।

আরবীতে রাজনীতির প্রতিশব্দ হিসেবে সিয়াসাহ শব্দটা ব্যবহার হয়। কিন্তু সিয়াসাহ নিয়ে আগেকার যুগে যারা লিখেছেন তাঁদের আলোচনা কিন্তু শাসকের করণীয়, শাসনব্যবস্থা ও শাসকের করণীয় এ ব্যাপারে শরীয়াহর দিকনির্দেশনা ও শর্তের মতো বিষয়াদি নিয়ে। এই বিষয়গুলো আধুনিক সময়ে আলোচিত হয় গভর্ন্যান্স রিলেটেড লিট্রেচারে। রাজনীতি বলতে কিন্তু আমরা জাস্ট এগুলোকে বোঝাই না, রাজনীতি এর চেয়ে আরও অনেক ব্যাপক বিষয়।

অর্থাৎ পূর্বযুগে এই শব্দের ব্যবহার থাকলেও সেটা এখন আধুনিক একটা অর্থে ব্যবহার হচ্ছে। আর সেই আধুনিক অর্থ এবং যে ফেনোমেনন বোঝাতে এই শব্দ ব্যবহার হচ্ছে, সেটা এসেছে ইউরোপ থেকে।

প্রায় একই ধরণের কথা তুরাস শব্দটার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। তুরাস এখন ট্র্যাডিশান বা হেরিটেজ অর্থে ব্যবহার হয়। বিশেষ করে ইসলামী ট্রেডিশন অর্থে। কুরআনে তুরাস শব্দটা এসেছে, কিন্তু উত্তরাধিকার সূত্রে রেখে যাওয়া সম্পত্তি হিসেবে। যেমন সূরা ফাজরে এসেছে। কিন্তু ইসলামী তুরাস সংক্রান্ত যে আলাপ এটা আধুনিক সময়ে তৈরি হয়েছে।

হাসান হানাফি, আল জাবেরিসহ বিভিন্ন আধুনিক আরব লেখক তুরাসকে ইসলামী চিন্তার কেন্দ্র হিসেবে উপস্থাপন করতে চেয়েছেন, এবং এজন্য তারা যে ফ্রেইমওয়ার্কটা নিয়েছেন সেটা এসেছে ইউরোপীয় রোমান্টিসিসম এবং হিস্টোরিসিসম থেকে, জার্মান Erbe এবং ফ্রেঞ্চ patrimoine।

কেউ যখন বলছে আমাদের তুরাস বা ইসলামি তুরাস আক্রান্ত; তখন তিনি কার্যত এমন একটা ক্যাটাগরি ব্যবহার করছেন যা আধুনিক।

ইভেন মানহাজ শব্দটার কথা চিন্তা করুন। মানহাজ শব্দটা নুসুসে আছে। পথ অর্থে। আগেরকার আলেমদের আলোচনায় সালাফদের মানহাজ, বা এধরণের শব্দাবলীর ব্যবহার আছে। ইবনু তাইমিয়্যাহর বই আছে মিনহাজুস সুন্নাহ নামে, এখানে মানহাজ অর্থ হল আকিদাহ, ইলম ও সার্বিকভাবে দ্বীনের ক্ষেত্রে নববী পথ নিয়ে।

আগেকার যুগের আলেমরা যখন মানহাজুস সালাফ বলতেন তাঁরা এর মাধ্যমে বোঝাতেন আকিদাহ, হাদীস, এখন আমরা যেগুলোকে ফিকহের বিষয় বলি সেগুলোর ব্যাপারে সালাফুস সালেহিনের দৃষ্টিভঙ্গি এবং পথকে।

কিন্তু এখন মানহাজ শুধুমাত্র এই অর্থে ব্যবহার হয় না। কেউ যখন বলে ইখওয়ানী মানহাজ, এইচটি-র মানহাজ, সালাফি মানহাজ, কুতুবী মানহাজ, লোকাল জি—দি মানহাজ, গ্লোবাল মানহাজ ইত্যাদি তখন সেখানে আরও কিছু অর্থ চলে আসে।

এখানে মানহাজ শব্দটা একটা আন্দোলন বা সংগঠনের টোটাল অপারেশনাল ডকট্রিন অর্থে ব্যবহার হতে শুরু করে। তাদের পলিটিকাল স্ট্র্যাটিজি, থিওরি অফ চেইঞ্জ, রাষ্ট্রের ব্যাপারে অবস্থান এবং মনোভাব, তাকফিরের ব্যাপারে অবস্থান, এমন অনেক কিছু সেখানে তখন যুক্ত হয়।

এই সুনির্দিষ্ট অর্থে মানহাজ শব্দের ব্যবহার সালাফুস সালেহিন কিংবা তার পরের আলেমগণের মধ্যেও পাওয়া যায় না। এই নির্দিষ্ট ব্যবহারগুলোর শুরু বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় ভাগে, সেই সময়ে ইসলামী আন্দোলনের বিভিন্ন তর্ক-বিতর্কের প্রেক্ষিতে। অর্থাৎ শব্দটা ক্লাসিকাল কিন্তু ব্যবহারটা আধুনিক।

দ্বীনের সাথে জড়িত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর অন্যতম—ইলম এর সাথে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর কথা চিন্তা করুন। নবিজী ﷺ-এর সময় থেকে শুরু করে প্রথম তিন প্রজন্ম এবং তারপরও আরও বেশ কিছুদিন ইলম অর্জনের ফরম্যাট ছিল হালাকাহ এবং ইজাযাহ।

আজকের সবচেয়ে বড় এবং প্রভাবশালী ইসলামী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর দিকে তাকান। মদীনা ইউনিভার্সিটি এবং আল-আযহার মতো জায়গাগুলোতে অনার্স, মাস্টার্স, পিএইচডি আছে। এগুলো কুরআন-সুন্নাহ, সালাফুস সালেহিন কিংবা উম্মাহর ইমামদের কার কথায় আছে? প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রির যে ফরম্যাট, সেটা কি সালাফদের সময়ে ছিল? এই পুরো ফরম্যাটটাই আধুনিক।

দারুল উলুম দেওবন্দের মতো প্রতিষ্ঠান, যেটাকে অ-আধুনিক হিসেবে সমালোচনা করা হয়ে, সে ক্ষেত্রেও বারবারা মেটক্যাফ তার গবেষণায় বিস্তারিতভাবে দেখিয়েছেন অর্গানাইযেইশানাল এবং ব্যুরোক্রেটিক অ্যাডমিনস্ট্রেশনের যে কাঠামো এখানে গড়ে উঠেছে তার অনেক কিছু কলোনিয়াল সময়ের বাস্তবতা এবং বিধিবিধান দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিল। ।

আজকে আরব বিশ্ব থেকে শুরু করে পাশ্চাত্য ও প্রাচ্যে অনেকেই অনলাইন কোর্স করান। বাংলাদেশে তো অনেকেই করান। অ্যাকাডেমি তৈরি করেন। এই ফরম্যাট কি কুরআন-সুন্নাহতে আছে? অ্যাকাডেমি শব্দটা ইসলামী শব্দ? এটা কি মুসলিমদের শব্দ?

এই প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষে যুক্তি কী হতে পারে?

যুক্তি হবে এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে কিংবা কোর্সে কিংবা অ্যাকাডেমিতে যা শিখানো হচ্ছে সেটা ইসলামী, সেটা ক্লাসিকাল ইলমই। ইসলাম বিরুদ্ধ কিছু না। হারাম কিছু না। তবে পরিবর্তিত বাস্তবতার কারণে ভিন্ন ভিন্ন ফরম্যাট গ্রহণ করা হয়েছে। শরীয়াহর শিক্ষা ও সীমানার সাথে সাংঘর্ষিক না হলে এতে কোন সমস্যা নেই।

আমি এই যুক্তির সাথে একমত।

কিন্তু এই যুক্তি কি আমরা কনসিসটেন্টলি প্রয়োগ করবো?

কুরআন-সুন্নাহতে নেই, সালাফুস সালেহিনের যামানায় নেই, ইমামগণ করেননি, অতএব অমুক জিনিস বাতিল—এই মাপকাঠি কি সব ক্ষেত্রে প্রয়োগ হবে? নাকি খেয়ালখুশি মতো?

৪.

বাস্তবতা হল, আধুনিকতা পানির মতো, আমরা মাছের মতো। মাছকে পানি ঘিরে রাখে, সে সেটা চাক, বা না চাক। আর যেহেতু সে পানির মধ্যেই থাকে তাই তার গা ভেজে।

বর্তমানে ইসলামী আন্দোলন থেকে শুরু করে শিক্ষা, সমাজ, সংস্কৃতি, সভ্যতা, লড়াইসহ প্রায় সব বিষয়ের আলোচনাতে আধুনিক শব্দ, পরিভাষা এবং চিন্তার আর্কিটেকচার ঢুকেছে।

প্রায় সব ক্ষেত্রেই এমন সব শব্দ, পরিভাষা, কাঠামো ও কনসেপ্ট ব্যবহার করা হচ্ছে যেগুলো ভিন্ন জায়গা থেকে এসেছে, অথবা পুরনো শব্দের ভেতরে নতুন ধারণা ঢোকানো হয়েছে।

উলামায়ে কেরাম বলুন, ইসলামী আন্দোলনগুলো বলুন বা গবেষকরা বলুন; বুদ্ধিবিবেচনা সম্পন্ন কেউ স্রেফ শব্দের কারণে কোন কিছু নাকচ করেননি।

এখানে মূলনীতি হল শব্দের দ্বারা যা বোঝানো হচ্ছে সেটা কি ইসলামের সাথে সংগতিপূর্ণ কি না? সেটা হালাল-হারামের সীমার মধ্যে থাকছে কি না, সেটা শরীয়াহর কোন অংশের সাথে সাংঘর্ষিক হচ্ছে কি না, তার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয়া।

এব্যাপারে অনেক উদ্ধৃতি দেখানো সম্ভব, আমি এখানে শুধু শাইখ মুহাম্মাদ সালিহ আল মুনাজ্জিদের একটা ছোট উদ্ধৃতি শেয়ার করছি। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছেন:

আমাদের এই মূলনীতি বুঝতে হবে যে, নতুন পরিভাষা ব্যবহারে কোনো দোষ নেই। ফকিহ এবং উসুলশাস্ত্রের পণ্ডিতদের নিকট এই নীতিটি সুপরিচিত। ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) বলেছেন: “নতুন কোনো ধারণা কিংবা নতুন শব্দ চয়নে কোনো বাধা নেই, যদি না তার মাঝে মন্দ কিছু থাকে।” — মাদারিজুস সালিকিন, ৩/৩০৬ [১]

দ্বীন ইসলাম কোন ছেলেখেলা না যে স্রেফ আবেগের ওপরে, বা ভাইবের কারণে, বা কারো পক্ষ বা বিপক্ষে তর্ক করার জন্য কেউ কোন অবস্থান নেবে বা সেটা পরিবর্তন করবে। অথবা মানুষের কথা ও কাজের মধ্যে মিল থাকবে না। কেউ যে জিনিসের জন্য আরেকজনের সমালোচনা করছে নিজেই সে কাজ করে বেড়াচ্ছে। এবং সিলেকটিভলি একেকসময় একেক আর্গুমেন্ট ব্যবহার করছে।

দ্বীন ইসলামের ক্ষেত্রে যেকোন আলোচনা এবং মতপার্থক্যের ক্ষেত্রে যিনি ভিন্নমতপোষণ করছেন তার প্রতি আমভাবে সুধারণা রাখা, তার অবস্থানের বিরোধিতা করলেও সেটা সততার সাথে তুলে ধরা, এবং নিজের ক্ষেত্রে যে মানদণ্ড ব্যবহার করছি সেটা তার ক্ষেত্রেও ব্যবহার করা উচিত। নিজেদের অবস্থানগুলো সুনির্দিষ্ট উসুলের ভিত্তিতে হওয়া উচিত এবং সেই উসুল সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া দরকার।

৫.

আধুনিক যুগে ইসলামী শাসন ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে বিভিন্ন ইসলামী আন্দোলন গড়ে উঠেছে। বিভিন্ন বিষয়ে মতভেদ থাকলেও মোটা দাগে এ আন্দোলনগুলো একমত যে, ইসলামী শাসন কায়েম করতে হলে দুটো বিষয় আবশ্যক:

  • কোন নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের ওপর শাসনকর্তৃত্ব বা তামকীন অর্জন
  • বিদ্যমান ব্যবস্থাকে ইসলামী শাসনব্যবস্থা দিয়ে প্রতিস্থাপন

এই দুটো ধাপের পরিবর্তনকে (পরিবর্তনের কোন নির্দিষ্ট পদ্ধতিকে না) ইনকিলাবে ইসলামী বা ইসলামি বিপ্লব বলা হচ্ছে।

এই পরিবর্তনের সাথে কোন মুসলিম দ্বিমত করবে?

মুসলিমদের জন্য ইসলাম ছাড়া অন্য কোন শাসনব্যবস্থার অধীনে থাকা বৈধ না, শাসকের মধ্যে যদি স্পষ্ট কুফর পাওয়া যায় তাহলে মুসলিমদের দায়িত্ব তাকে অপসারণ করা, প্রয়োজনে বলপ্রয়োগ করে হলেও—এগুলো তো ক্লাসিকাল ফিকহেরই আলাপ।

পরিবর্তনের ক্ষেত্রে দুটো দৃষ্টিভঙ্গি আছে।

একটা হল বিদ্যমান কাঠামোকে রেখে দিয়ে শাসক পরিবর্তন ও কিছু সীমিত মেরামতি, আরেকটা হল বিদ্যমান কাঠামোকে অপসারণ করে নতুন করে ইসলামী কাঠামো নির্মাণ।

প্রথম অ্যাপ্রোচটাকে রাজনৈতিক পরিভাষায় সংস্কার বলা হয়, পরেরটাকে বিপ্লব। এ দুটোর মধ্যে কোনটা দ্বীন ইসলামের সাথে অধিক সামঞ্জস্যপূর্ণ?

তাহলে শব্দের দ্বারা যা বোঝানো তা যদি ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক না হয়, বরং ইসলামসম্মত হয়, এবং এই শব্দ যদি বিভিন্ন ঘরানার উলামা, আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ ও গবেষকরা ব্যবহার করে থাকেন, এতে সমস্যাও না দেখেন, তাহলে আপত্তির ভিত্তি আসলে কী?

দাওলাহ, সিয়াসাহ, তানযীম, হিযব, সাকাফা, হাদারাহ, তুরাস, মানহাজ (কালাম শাস্ত্র, সুফি তরীকাহ এসব নিয়ে নাহয় আলাপে না হয় না-ই গেলাম)— এইসব এবং এরকম আরও বহু বহু কিছু মেনে নিয়ে যদি শুধু বিপ্লব শব্দের ব্যাপারে আপত্তি কেউ করে, তাহলে সেটাকে নীতিগত কোন অবস্থান বলা যায় না। এখানে কেবল সিলেক্টিভলি একটা ফিল্টার ব্যবহার করা হচ্ছে, হয় না জেনে, অথবা না বুঝে অথবা বিরোধিতার খাতিরে।