‘দ্বীনের খাতিরে’


আমরা নানাভাবে আত্মপ্রতারণা করি। কিন্তু অদ্ভূত ব্যাপারটা হল অধিকাংশ সময়, আত্মপ্রতারণাগুলোকে আমরা প্রতারণা ভাবি। সুন্দর সুন্দর অজুহাতগুলো দেয়ার সময় আমরা ভাবি, আমরা বুঝি অন্য কাউকে বুঝ দিচ্ছি। নিজের চিন্তা, সিদ্ধান্ত, বর্তমানকে ঠিক প্রমাণ করার জন্য আমরা বিভিন্ন যুক্তিতর্কের মারপ্যাঁচ তৈরি করি, আর ভাবি এভাবে তর্কে জেতা গেল। কারো মুখ বন্ধ করানো গেল, কিংবা ঠিক প্রমাণ করা গেল নিজেকে। আমরা মনে করি এভাবে আমরা অন্যদের ধোঁকা দেই। সেটা সৃষ্টি হোক কিংবা স্রষ্টা। কিন্তু আমরা আসলে ধোঁকা দেই নিজেদেরকেই। একটা ভুলকে ভুল জেনে, মনের খচখচানিটা উপেক্ষা করে, যখন অন্যের সামনে আমরা সেটা জায়েজ করি তখন চূড়ান্ত হিসেবে ক্ষতিটা হয় আমাদের নিজেদের। দুনিয়ার সবাইকে সব কিছু বুঝিয়ে চুপ করানো যায়, কিন্তু আটকানোর হলে শেষ বিচারে আটকাতে হবে আমাদেরকেই।

একটা বাস্তব উদাহরণ হল ‘দ্বীনের খাতিরে’ নিজের দুনিয়াকে জায়েজ করা। চরম পর্যায়ের ক্যারিয়ারিস্ট কিংবা ক্যাপিটালিস্টিক চিন্তাকে আমরা জায়েজ করি দ্বীনের অজুহাতে –

আমি অমুক চাকরি করতে চাই কারণ এতে দ্বীনের লাভ হবে। আমি অমুক ব্যবসা করতে চাই কারণ এর মাধ্যমে মুসলিমদের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি হবে। আমি বিদেশী ডিগ্রি চাই কারণ এতে উম্মাহর খেদমত হবে, আমি কুফফারের দেশে থাকতে চাই কারণ এতে দাওয়াহ হবে।

তাই ভাই? সিরিয়াসলি? এটাই আপনার ডিসিশানের পেছনে মূল ড্রাইভিং ফ্যাক্টর? আপনার মূল মোটিভেইশান? উম্মাহর খেদমতের আর কোন উপায় আপনার চোখে পড়লো না? শুধু ওটাতেই উম্মাহর খেদমত দেখতে পেলেন যেটা আপনার পরিবারের এক্সপেক্টেশান আর আপনার প্রেফারড ক্যারিয়ার পাথের সাথে সুন্দরভাবে অ্যালাইনড হয়ে গেল? ব্যাপারটা অনেকটা ‘আরে গাইনির ডাক্তার লাগবে না!’ বলে মেয়েদের সহশিক্ষার পক্ষে যুক্তি দেয়ার মতো। গাইনির ডাক্তার তো লাগবে, কিন্তু কতোজন উচ্চমাধ্যমিকের পর পড়াশুনা করে, আর ফি বছর উম্মাহ কতোজন গাইনির ডাক্তার পায়? উম্মাহর খেদমতে কতোজন বছর বছর নিজেদের এভাবে ‘উজার’ করে, আর উম্মাহ তাতে কী পায়?

এভাবে কতো দশক ধরে উম্মাহর খেদমত হচ্ছে ভাই? কতো বিসিএস ক্যাডার, সিআইপি, বিদেশী ডিগ্রি আর নন-রেসিডেন্ট মুসলিম আসলো, গেলো? উম্মাহ কয়জন উসমান, আমর আর খালিদকে পেলো? রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুম ওয়া আজমাইন। আচ্ছা এতো কঠিন আদর্শ বাদ, উম্মাহ কয়জন শাজুল ইসলাম,তৌকির শরীফ আর বিলাল আবদুল করিমকে পেলো? আর কয়জন গুড-ফর-নাথিং হামবড়া বিদ্বান পেলো?

সকল নবী-রাসূল আলাইহিমুস সালাতু ওয়াস সালাম এর ঘটনা এবং সাহাবায়ে কেরাম রাদ্বীয়াল্লাহু আনহুম ওয়া আজমাইন এর জীবনি থেকে একটা শিক্ষা স্পষ্ট। তাঁরা তাওহিদের জন্য, ইসলামের জন্য দুনিয়াকে ত্যাগ করেছেন। দ্বীনের জন্য তাঁদের দুনিয়াকে ছাড়তে হয়েছে। সন্যাসী হয়তো হতে হয়নি কিন্তু করতে হয়েছে বিশাল সব স্যাক্রিফাইস। দ্বীনের জন্য কিছু করতে গেলে দুনিয়াবী কিছু স্যাক্রিফাইস করতে হবে। এটা একটা বেইসিক আন্ডারস্ট্যান্ডিং।

কিন্তু আমাদের সময় এসে ব্যাপারটা কেমন উল্টে গেল, তাই না? আমি আমার নিজের ক্যারিয়ার, নিজের লাইফস্টাইল, নিজের সোশ্যাল স্ট্যাটাসের জন্য অমুক চাকরি, অমুক ডিগ্রি, কিংবা অমুক দেশের পেছনে ছুটছি না। না, না! আরে আমি তো দ্বীনের জন্য করছি। এটা আমার প্রয়োজন না। দ্বীনের প্রয়োজনে করা।

নিজের স্বার্থে সিদ্ধান্ত নেয়া ইসলামে না-জায়েজ না। এবং অনেক ক্ষেত্রে ইসলামে প্রশস্থতা আছে। আধুনিক সময়ের অধিকাংশ আলিম সেই প্রশস্থতাকে আরো অনেক প্রশস্থ করেছেন। এটুকু তো যথেষ্ট। আপনি সেই প্রশস্থতার সুযোগ নিন না। কিন্তু এটাকে দ্বীন দিয়ে জাস্টিফাই করতে হবে কেন? এ ধোঁকাবাজি আলটিমেটলি কার সাথে?


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *