সংশয়বাদী – লেখকের ভূমিকা


মডার্নিটি মানবজাতির জন্য এবং ইসলামের জন্য হুমকি। কিন্তু মডার্নিটির এ বিপদকে বুঝতে হলে আমাদের কিছুটা পেছনে যেতে হবে। ঐতিহাসিকদের মতে মডার্নিটির শুরু ষোড়শ শতাব্দীতে। এই শতাব্দী ছিল ইউরোপের ইতিহাসের তীব্র উত্থান-পতনের সময়।

রিফর্মেশানের মাধ্যমে এ শতাব্দীতে শুরু হয় খ্রিষ্টানদের নিজেদের মধ্যেকার তিক্ত সংঘাত, যার ফলস্বরূপ জন্ম নেয় সেক্যুলারিসম। যুদ্ধ, রক্তপাত ও তীব্র বিভাজন ধর্ম ও বাইবেলের প্রতি ইউরোপের বুদ্ধিজীবীদের মনকে বিষিয়ে তোলে। ধর্ম আর বাইবেলকে মানুষ দেখতে শুরু করে অজ্ঞতা এবং দুর্দশার উৎস হিসেবে।


কিন্তু ঈশ্বর আর বাইবেলকে বাদ দিলে শূন্যস্থানে বসবে কে?

নৈতিকতার উৎস কী হবে? অস্তিত্বের প্রকৃতি এবং মানুষের চূড়ান্ত গন্তব্য নিয়ে প্রশ্নের জবাব মিলবে কোথা থেকে?


প্রথমদিকের মডার্নিস্টরা মেটাফিযিকাল ও দুনিয়াবি কর্তৃত্বের আসনে বসায় নিজেদের মনকে। তারা মনে করত মানব-মন এবং মানবীয় যুক্তিই পারে মানবজাতিকে পথ দেখাতে। এই ধারণা আরও শক্তিশালী হয় গাণিতিক বিজ্ঞান এবং আইযাক নিউটনের পরীক্ষালব্ধ পদার্থবিজ্ঞানের সফলতা দেখার পর। তারা ধরে নেয়, যুক্তি এবং অভিজ্ঞতাজাত পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে মানব-মন পরিণত হতে পারে ঈশ্বরে। কারণ মানব-মনের আছে আবিষ্কার এবং যুক্তি ব্যবহারের অসীম ক্ষমতা। মহাবিশ্ব আর মানবপ্রকৃতি নিয়ে সব প্রশ্ন একদিন অঙ্কের মতো সমাধান হয়ে যাবে, এ কেবল সময়ের ব্যাপারমাত্র!


তবে জ্ঞান হলো গল্পের অর্ধেক। মাটির মানুষ শুধু জ্ঞানের বদৌলতে দেবতায় পরিণত হতে পারে না। সমীকরণের বাকি অর্ধেকটা হলো ক্ষমতা। অর্থাৎ নিজের ইচ্ছাকে বাস্তবায়ন করতে পারা। মনের মতো করে পৃথিবীকে বদলে নেয়া। আর এই ক্ষমতা অর্জিত হয় প্রযুক্তির মাধ্যমে। প্রযুক্তির অগ্রগতি এক ক্রমাগত চলমান প্রক্রিয়া। মডার্নিস্টদের কাছে এর অর্থ হলো, প্রযুক্তি মানুষকে অসীম শক্তি এবং দেবত্বের প্রতিশ্রুতি দেয়। জ্ঞান আর প্রযুক্তির মিশেলে অসীম ক্ষমতা অর্জন কেবল সময়ের ব্যাপার।


মডার্নিসমের সমীকরণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো সময়। মডার্নিসমের প্রধান বৈশিষ্ট্য প্রগতিবাদ। প্রগতিবাদ বলে, যত সময় যাচ্ছে তত মানুষের জ্ঞান ও ক্ষমতার অগ্রগতি হচ্ছে। বুদ্ধি ও নৈতিকতার দিক থেকে সভ্যতার উন্নতি হচ্ছে। আজকের মানুষ অতীতের মানুষের চেয়ে উত্তম। সময়ের সাথে সাথে মানবজাতি ছুটে চলেছে এক নিখুঁত কল্পরাজ্যের দিকে, যার সাথে তুলনা চলে কেবল ধর্মীয় গ্রন্থে বর্ণিত জান্নাতের সাথে। প্রগতির ওপর এই অন্ধ বিশ্বাস আধুনিকতাবাদের ভিত্তি। বুদ্ধিজীবী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ, সবাই প্রগতিবাদের এই অবস্থানকে মেনে নেয় স্বতঃসিদ্ধ এবং প্রশ্নাতীত সত্য হিসেবে। আর এখান থেকেই মডার্নিটির বিপজ্জনক প্রকৃতির বিষয়টা স্পষ্ট হতে শুরু করে।

প্রগতিবাদের অর্থ হলো পরিবর্তন মাত্রই ইতিবাচক। পরিবর্তনই স্বতন্ত্র লক্ষ্য এবং মূল্যবোধ। অন্যদিকে স্থিরতা হলো অনৈতিক। পরিবর্তনের বিরোধিতাকে তাই দেখা হয় আক্ষরিক অর্থেই মানবজাতির ওপর আক্রমণ হিসেবে।

মডার্নিটির প্রধান শত্রু তাই ট্র্যাডিশান। কারণ ট্র্যাডিশানের প্রতি অঙ্গীকারের অর্থ পরিবর্তন প্রতিরোধ করা। কিছু নীতিকে অপরিবর্তনীয়, চিরন্তন, ধ্রুব হিসেবে গ্রহণ করা। এগুলোর সংস্কার করা সম্ভব না, এগুলো আপডেট করা সম্ভব না। ট্র্যাডিশানের প্রতি অঙ্গীকারাবদ্ধ হবার অর্থ অতীতের সাথে সম্পর্ক ধরে রাখা, কোনো-না-কোনোভাবে অতীতের ওপর নির্ভর করা। আর এই বৈশিষ্ট্যই মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয় ট্র্যাডিশান আর মডার্নিটিকে। সাংস্কৃতিক, ভাষাতাত্ত্বিক এবং বিশেষ করে ধর্মীয় ট্র্যাডিশান মডার্নিটির প্রবর্তন আর সংস্কারের বুলডোজারের নিচে পিষ্ট হবার নিরন্তর হুমকির মধ্যে থাকে। আধুনিক পৃথিবীতে ধর্মীয় ট্র্যাডিশানের কোনো স্থান নেই।


আধুনিক চিন্তার পেছনে সব সময় একটা ধারণা কাজ করে–
জীবনের সব মৌলিক প্রশ্নের যদি উত্তর মডার্নিটি এবং আধুনিক জ্ঞানতত্ত্বগুলো দিতে পারে, তাহলে ধর্মের প্রয়োজন কী?

মানুষ কোথা থেকে এল?
মডার্নিটির জবাব : ডারউইনিসম এই প্রশ্নের উত্তর দেয়

মহাবিশ্ব কীভাবে কাজ করে?
মডার্নিটির জবাব : বিজ্ঞান এ প্রশ্নের উত্তর দেয়

ভালো কিংবা নৈতিক হবার অর্থ কী?
মডার্নিটির জবাব : লিবারেলিসম এ প্রশ্নের উত্তর দেয়–অন্যের সাথে এমন আচরণ করো, যেমন আচরণ তুমি নিজের জন্য চাও। সমতা আর স্বাধীনতাই সর্বশ্রেষ্ঠ মূল্যবোধ।

সবকিছুর অর্থ আসলে কী?
মডার্নিটির জবাব : কোনো নির্দিষ্ট অর্থ নেই। আমরা নিজেই নিজেদের মতো করে অর্থ বানিয়ে নিই। আমরা মহাবিশ্বের অসীম শূন্যতায় ইতস্তত ভেসে বেড়ানো পরমাণুর সমষ্টিমাত্র।

আধুনিক মানসিকতা অনুযায়ী তাই ধর্মের কোনো প্রয়োজন নেই। সব প্রশ্নের উত্তর আধুনিক মানুষ আগেই বের করে রেখেছে। মৌলিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ কোনো কিছু ধর্ম দিতে পারে না। আধুনিকতা মনে করে মানুষ ধর্ম পালন করে কালচারাল বায়াসের কারণে অথবা অভ্যস্ততা আর অভ্যাসের বশে। ধর্ম পালনের আর কোনো কারণ, আর কোনো যৌক্তিক ব্যাখ্যা নেই। আধুনিকতার চোখে তাই প্রগতির সবচেয়ে বড় শত্রু হলো সংকীর্ণমনা অন্ধ বিশ্বাসী–যে হাজার বছরের পুরোনো কিতাব আঁকড়ে থাকে। ধর্ম হলো প্রগতির অন্তরায়। আর তাই মিডিয়া, শিক্ষা, আইন, বৈশ্বিক রাজনীতিসহ বিভিন্ন দিক থেকে বহুমাত্রিক আক্রমণ চালিয়ে ধর্মকে ধ্বংস করতে চায় আধুনিকতা। এই আক্রমণ তীব্র এবং ব্যাপক।

ইসলামকে মডার্নিটির প্রতিতত্ত্ব (antithesis) বললে ভুল হবে না। মডার্নিটির দার্শনিক কাঠামো গড়ে উঠেছিল অষ্টাদশ এবং ঊনবিংশ শতাব্দীর ইউরোপীয় এনলাইটেনমেন্ট চিন্তাবিদদের হাতে। তাদের চোখে ইসলাম ছিল খ্রিষ্টবাদের আরও বর্বর এবং পশ্চাৎপদ এক সংস্করণ। বিখ্যাত ফরাসী দার্শনিক এবং নাস্তিক ভলতেয়ার তার লিখিত ‘ম্যাহোমেট’ শিরোনামের নাটকে নবী সাল্লাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে উপস্থাপন করেছিল উন্মাদ স্বৈরাচার হিসেবে আর কুরাইশ মুশরিকদের চিত্রিত করেছিল মুক্তচিন্তার প্রতিনিধি হিসেবে।

ইসলামের ব্যাপারে অধিকাংশ ইউরোপীয় দার্শনিকদের চিন্তা ছিল তিক্ত ওরিয়েন্টালিসমের (প্রাচ্যবাদ) রঙে রাঙানো। তাদের চোখে ইসলাম স্বৈরাচারী আর আধুনিকতা হলো স্বাধীনতা। ইসলাম অযৌক্তিক আর আধুনিকতা প্রধান স্তম্ভই হলো মানবীয় যুক্তি। ইসলামের অর্থ স্থবিরতা ও ক্ষয়, অন্যদিকে আধুনিকতার অর্থ নিরন্তর পরিবর্তন আর নবায়ন।

বুদ্ধিবৃত্তিক দ্বন্দ্বের এ ইতিহাস ছাড়াও, প্রকৃতিগতভাবেই মডার্নিটি ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক। কারণ, সব ধর্মের মধ্যে ইসলামই আজও অপরিবর্তিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুন্নাহর সংরক্ষণ ইসলামের মৌলিক শিক্ষার অংশ। প্রথম প্রজন্মের মতো করে দ্বীন পালন করা ইসলামে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামের পুরো জ্ঞানতত্ত্ব তৈরি হয়েছে অতীতে আসা ইলমের সংরক্ষণ ও হস্তান্তরের ওপর। ইসলামে শুধু ওয়াহি নাযিল হবার সময়কার জ্ঞানের কথা আসেনি; বরং পৃথিবীতে মানব-অস্তিত্বের আগের জ্ঞানের কথাও এসেছে।

মহান আল্লাহ বলেছেন,


স্মরণ করো, যখন তোমার প্রতিপালক আদমসন্তানদের পৃষ্ঠ হতে তাদের বংশধরদের বের করলেন আর তাদেরই সাক্ষী বানিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আমি কি তোমাদের প্রতিপালক নই?’ তারা বলল, ‘হ্যাঁ, আমরা সাক্ষ্য দিলাম।’ যাতে কিয়ামতের দিন তোমরা বলতে না পারো যে, নিশ্চয় আমরা এ বিষয়ে অনবহিত ছিলাম। [তরজমা, সূরা আল-আ’রাফ, ১৭২]

মহান আল্লাহর অস্তিত্ব, তাঁর একত্ব, তাঁর উপাস্য হবার একক অধিকার–এই জ্ঞান মানুষের সহজাত প্রকৃতি তথা ফিতরাহর মধ্যে সংরক্ষিত। এই সহজাত প্রকৃতিই মানুষকে ধাবিত করে কল্যাণ এবং বিশুদ্ধতার দিকে। দুনিয়ার টানাপড়েন, শিরক, নাফস, কাম, লালসা, খেয়ালখুশি কিংবা শয়তানের ওয়াসওয়াসার ফলে এই ফিতরাহ কলুষিত হয়। ইসলামের আমল ও বিধি-বিধানগুলো মানুষের ফিতরাহকে সংরক্ষণ করে এক আল্লাহর ইবাদতে ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে।

মনের নিয়ন্ত্রণও একইরকমভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, মুমিনকে তার খেয়ালখুশি এবং ইচ্ছেকে শরীয়াহর অনুগামী করতে হয়, চেষ্টা করতে হয় সর্বদা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের। এই মূল্যবোধগুলো এবং চিন্তার এই পুরো কাঠামোই আধুনিকতাবাদ এবং এর সহগামী মতবাদগুলোর সাথে সাংঘর্ষিক।


তবে ইসলাম ও মডার্নিটির মধ্যে বৈরিতা কেবল তাত্ত্বিকতায় সীমাবদ্ধ থাকেনি। মুসলিমদের সাথে মডার্নিটির অনুসারীদের সংঘাত শুরু হয় ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে, মুসলিম-বিশ্বে ইউরোপীয় উপনিবেশবাদের সুবাদে। ঔপনিবেশিক শক্তিগুলোর প্রথম লক্ষ্য ছিল মুসলিম-বিশ্বের অর্থনৈতিক ক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রণ অর্জন।

দ্বিতীয় লক্ষ্য ছিল, ‘সপ্তম শতাব্দীতে আটকে থাকা বর্বর মুসলিমদের’ মডার্নিটি ও প্রগতির আলোতে নিয়ে আসা। এই দুই লক্ষ্য অর্জনের পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায় ইসলাম। মুসলিম মানসের ওপর ইসলামের প্রভাবকে দুর্বল করার জন্য ইউরোপীয়রা তখন এখন সূক্ষ্ম কৌশল গ্রহণ করে। উত্তর আফ্রিকা থেকে ইন্দোনেশিয়া পর্যন্ত ইসলামী শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান এবং আলিমদের নিশানা বানায় উপনিশবাদী প্রকল্প। ধীরে ধীরে তাদের অর্থের উৎসগুলো বন্ধ করে দেয় আর সেখানে গড়ে তোলে ইউরোপিয়ান, সেক্যুলার প্রতিষ্ঠান।

ইসলামী জ্ঞানের ভাষা (আরবী) থেকে শুরু করে ইসলামী পোশাক, এমনকি ইসলামী পারিবারিক কাঠামোও শিকার হয় ঔপনিবেশিক আক্রমণের। ধাপে ধাপে ইসলামী পরিচয় ও সংস্কৃতিকে ধ্বংস করা হয় মুসলিম-বিশ্বের বিভিন্ন অংশে। আধুনিকতার আগ্রাসনের মুখে মুমূর্ষু অবস্থায় কিছুদিন টিকে থাকার পর ১৯২৪ সালে পুরোপুরিভাবে অবসান ঘটে খিলাফাত-ব্যবস্থার। ইসলামী সমাজের ওপর চাপিয়ে দেয়া এই আগাগোড়া পরিবর্তনের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল ধ্বংস ও হত্যা। অনেক ক্ষেত্রে সরাসরি জেনোসাইড। ‘প্রগতির পথে বাধা’ হবার কারণে ইউরোপীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো মুসলিমদের হত্যা করা হয় পাইকারিভাবে।

শেষ হিসেবে দেখা গেল, প্রগতি ও এনলাইটেনমেন্টের পশ্চিমা দেবতার বেদিতে বলি দেয়া হয়েছে কয়েক কোটি মুসলিমকে।

যেসব মুসলিম প্রাণে বেঁচে গেল তারা এবং তাদের সন্তানেরা মগজধোলাইয়ের শিকার হয়ে একসময় মডার্নিটি এবং এর মতবাদগুলো গ্রহণ করতে শুরু করল। পশ্চিমা শিক্ষা-ব্যবস্থা, মিডিয়া, সাহিত্য এবং রাজনৈতিক প্রভাবের মাধ্যমে মুসলিমদের মনে গেঁথে দেয়া হলো,

‘আধুনিক = ভালো’।

আধুনিকায়িত মুসলিমরা গ্রহণ করল এক প্যারাডক্সিকাল চিন্তা–মুসলিম উম্মাহর হারানো গৌরব ফিরে পাবার চাবিকাঠি হলো আধুনিকতাবাদ।

কর্তৃত্বের অবস্থানে ফিরে যেতে হলে অনুসরণ করতে হবে পশ্চিমের। আধুনিক পশ্চিমের মতবাদ, দর্শন, রাজনীতি, লাইফস্টাইল, বিজ্ঞান, অর্থনীতি–অনুকরণ করতে হবে সবকিছু।

এই ধারণা আজও অতটাই শক্তিশালী যতটা ছিল ২০০ বছর আগে। আর গতকালের মতো আজও এ ধারণা মিথ্যা।

আধুনিকতাবাদ গ্রহণের অর্থ ইসলামকে ত্যাগ করা। আধুনিকতাবাদের অনুসরণ করে মুসলিমরা যদি কোনোদিন পশ্চিমের ওপর বিজয়ী হয়-ও, তাহলে ততদিনে তারা আর মুসলিম থাকবে না। যদি এমন ‘বিজয়’ কখনো আসে, তাহলে সেটা হবে ফাঁপা, অর্থহীন। ইসলাম ছাড়া অন্য কোনোভাবে সত্যিকারের বিজয় আসতে পারে না। মহান আল্লাহ আমাদের জানিয়ে দিয়েছেন–

…আর সাহায্য ও বিজয় কেবল পরাক্রমশালী প্রজ্ঞাময় আল্লাহর পক্ষ থেকে। [তরজমা, সূরা আলে ইমরান, ১২৬]

আমরা একে অলঙ্ঘনীয় এবং অনতিক্রম্য সত্য বলে বিশ্বাস করি।
আধুনিকতাবাদের বিষাক্ত প্রকৃতিকে চিনতে পারলে, মুসলিম মানসে এর ক্ষতিকর প্রভাবের বিষয়টা পরিষ্কার হয়ে যায়। একই মনে মডার্নিটির প্রগতিবাদ আর ইসলামের ট্র্যাডিশানালিসম কীভাবে সহাবস্থান করতে পারে?

যে মানুষ প্রগতিবাদে বিশ্বাসী–যে মনে করে মানুষ ক্রমেই বুদ্ধিবৃত্তিক এবং নৈতিকভাবে উন্নত হচ্ছে, আজকের মানুষ অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় অধিক নৈতিক–সে কীভাবে বিশ্বাস করবে সর্বশ্রেষ্ঠ প্রজন্ম হলো নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর প্রজন্ম এবং পরবর্তী দুই প্রজন্ম?

এ দুই অবস্থান একইসাথে ধারণ করা সম্ভব না। কিন্তু কলোনাইযড মুসলিমের মন এই দুই সাংঘর্ষিক অবস্থানের মধ্যে সমন্বয়ের জন্যে নানান কসরত করতে থাকে।


‘হয়তো সমাধান ইসলামের সংস্কার করার মধ্যে। হয়তো সমাধান ইসলামকে আধুনিকতার মাপকাঠিতে আপডেট করায়। হয়তো ইসলামের যা কিছু লিবারেলিসম, সেক্যুলারিসম, নারীবাদ, বস্তুবাদ, বিজ্ঞানবাদ, ইত্যাদির সাথে সাংঘর্ষিক, সেগুলো মুছে ফেললেই সমাধান হবে!


মুসলিমরা আজ ব্যাপকভাবে যেসব সংশয়ে আক্রান্ত হচ্ছে, এ ধরনের চিন্তাগুলোই তার উৎস। এই সংকট ও সংশয়গুলোর মুখোমুখি হলে আধুনিকাতাবাদ দ্বারা কলুষিত মুসলিম মন চিন্তা করে আধুনিকতার ছাঁচে ফেলে ইসলামকে কাটছাঁট করার, অর্থাৎ ইসলামকে বিকৃত করার। কিন্তু দ্বীন ইসলামকে বিকৃত করার বদলে তাদের আসলে আধুনিকতাবাদের ছাঁচকে ভাঙার চিন্তা করা উচিত। আর আধুনিকতার ছাঁচকে ভাঙতে হলে ওইসব মতবাদ আর তন্ত্রমন্ত্রের ব্যবচ্ছেদ করতে হবে, যেগুলো আজ মুসলিমদের মন্ত্রমুগ্ধ করে রেখেছে।


মুসলিম মন যখন এই বিষাক্ত মতবাদগুলোর আবর্জনা থেকে মুক্ত হবে, সে যখন চিন্তার দাসত্বের শেকলকে ছিঁড়বে, আধুনিকতার মগজধোলাই থেকে বের হয়ে আসবে, যখন তার চিন্তার বি-উপনিবেশিকরণ হবে–তখনই ইসলামের বিশুদ্ধ আলোতে সে স্পষ্টভাবে বাস্তবতাকে বুঝতে শিখবে।


ড্যানিয়েল হাক্বিকাতযু, The Modernist Menace To Islam বইয়ের ভূমিকা থেকে। বাংলায় ‘সংশয়বাদী নামে অনূদিত।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *